সুরা যিলযাল : আরবি পাঠ, বঙ্গানুবাদ, শানে নুযুল, তাফসির ও শিক্ষণীয় দিক

সুরা যিলযাল : আরবি পাঠ, বঙ্গানুবাদ, শানে নুযুল, তাফসির ও শিক্ষণীয় দিক ◇



 সুরার আরবি পাঠ (Surah Al-Zalzalah / Surah Az-Zilzal)

 بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ ١. إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا ٢. وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا ٣. وَقَالَ الْإِنْسَانُ مَا لَهَا ٤. يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا ٥. بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَىٰ لَهَا ٦. يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ ٧. فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ ٨. وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ --- 


 ◇ বঙ্গানুবাদ (বাংলা অর্থ)

 ১. যখন পৃথিবী তার প্রচণ্ড কম্পনে কম্পিত হবে, ২. এবং পৃথিবী তার সব বোঝা (গোপন ভান্ডার ও মৃতদেহ) বের করে দেবে, ৩. আর মানুষ বলবে, ‘এর কি হয়েছে?’ ৪. সেদিন সে (পৃথিবী) তার সংবাদ বর্ণনা করবে, ৫. কারণ তোমার রব তাকে তা প্রকাশ করার নির্দেশ দেবেন। ৬. সেদিন মানুষ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে বের হবে— যাতে তাদের কাজকর্ম তাদের দেখানো হয়। ৭. অতএব যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে— সে তা দেখবে। ৮. আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে— সেও তা দেখবে। --- 


 ◇ শানে নুযুল (নাজিলের প্রেক্ষাপট) 

 সুরা যিলযাল মদীনায় নাজিল হয়েছে— যদিও কিছু মুফাসসির এটিকে মক্কীও বলেছেন। এর নাযিল হওয়ার মূল প্রেক্ষাপট হলো মানুষের মাঝে কিয়ামত সম্পর্কিত সন্দেহ ও অজ্ঞতা। আরবদের একাংশ তখনো বিশ্বাস করত না যে কিয়ামত ঘটবে, মৃতরা জীবিত হবে, মানুষের আমল প্রকাশ পাবে। সুরাটি নাযিল হয় মানুষের হিসাব-নিকাশ, কিয়ামতের ভূমিকম্পের ভয়াবহতা এবং অতি সূক্ষ্ম আমলেরও বিচার হবে— এসব স্পষ্টভাবে জানিয়ে জাগ্রত করার জন্য। সাহাবিরা বর্ণনা করেছেন— আকাবা ইবনে আমির (রা.) বলেন, নবী (সা.) সুরা যিলযালকে কুরআনের এক-চতুর্থাংশের সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ এতে কিয়ামত, হিসাব, আমলের পরিণতি— এই তিনটি মৌলিক বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। --- ◇ তাফসির ও ব্যাখ্যা ১. “যখন পৃথিবী তার প্রচণ্ড কম্পনে কম্পিত হবে”— (আয়াত ১) কিয়ামতের দিন এমন ভূমিকম্প হবে যা মানব ইতিহাসের সব ভূমিকম্পের সম্মিলিত শক্তিকেও অতিক্রম করবে। এটি হবে পৃথিবীর শেষ কাঁপুনি— যা দ্বারা পৃথিবীর সমস্ত কাঠামো ভেঙে যাবে। মুফাসসিরগণ বলেন— এটি এত ভয়াবহ হবে যে পর্বতগুলো গুঁড়ো হয়ে যাবে, সমুদ্র উথলে উঠবে, আকাশ ছিঁড়ে যাবে। এই ভূমিকম্প শুধু প্রাকৃতিক নয়— বরং আল্লাহর নির্দেশে পৃথিবীর অন্তিম সময়ের বড় ঘটনা। --- ২. “পৃথিবী তার সব বোঝা বের করে দেবে”— (আয়াত ২) এখানে ‘বোঝা’ বলতে বোঝানো হয়েছে— ভূগর্ভে লুকানো ধন-সম্পদ, গোপন রহস্য, কবরের মৃতদেহ, মানুষের লুকানো আমল। মহাপ্রলয়ের দিন পৃথিবী সবকিছু উন্মুক্ত করে দেবে। কোনো লুকোচুরি থাকবে না। --- ৩. “মানুষ বলবে— এর কি হয়েছে?”— (আয়াত ৩) যখন কিয়ামতের ঘটনা শুরু হবে— মানুষ বিস্ময়ে, আতঙ্কে চিৎকার করবে। পৃথিবীর ভয়াবহ কম্পন দেখে মানুষ বুঝতে পারবে— আর লুকানোর উপায় নেই। এই প্রশ্নে ভয়-আতঙ্কের চরম বহিঃপ্রকাশ রয়েছে। --- ৪. “সেদিন সে (পৃথিবী) তার সংবাদ বর্ণনা করবে”— (আয়াত ৪) সেদিন পৃথিবী সাক্ষী দেবে— কে কোথায় কী করেছিল, কার ওপর কার অন্যায় হয়েছে, কোথায় ভালো কাজে অংশ নিয়েছে, কোথায় মন্দ কাজ হয়েছে— সব পৃথিবী নিজেই বলবে। মহানবী (সা.) বর্ণনা করেছেন: “মানুষ যে স্থানে সৎ-কাজ বা পাপ-কাজ করে— সেই স্থান কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।” (হাদিস) সুতরাং পৃথিবী তার স্মৃতি খুলে দেবে— এবং সব তথ্য উন্মোচন করবে। --- ৫. “তোমার প্রভু তাকে নির্দেশ দেবেন”— (আয়াত ৫) পৃথিবীর কাছে নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। আল্লাহ তাকে আদেশ করবেন— এবং পৃথিবী আদেশ পালন করবে। এতে বোঝা গেল— সকল সৃষ্টির কার্যক্রম আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। --- ৬. “সেদিন মানুষ বিভিন্ন দলে বের হবে”— (আয়াত ৬) মানুষ দলে দলে উঠবে— কে ভালো আমল করেছে, কে মন্দ আমল করেছে, কার নামা হাতে দেওয়া হয়েছে, কার ডান হাতে বই তুলে দেওয়া হয়েছে, কার বাম হাতে। এই "আশতাতান" শব্দে বোঝানো হয়েছে— মানুষকে কর্ম অনুযায়ী ভাগ করা হবে। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা হবে— কেউ নেককারদের দলে, কেউ পাপীদের দলে। --- ৭. “যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে— সে তা দেখবে”— (আয়াত ৭) এটি কুরআনের অন্যতম সুস্পষ্ট নৈতিক নীতি। আল্লাহ কোনো ভালো কাজ ছোট মনে করেন না। একটি ভালো কথা, একটি হাসি, একটি দান, একটি সাহায্য— অণুর মতো ছোট হলেও— এর মূল্য পাওয়া যাবে। এ আয়াত আশার আলোকসঞ্চারক। --- ৮. “যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে— সেও তা দেখবে”— (আয়াত ৮) যেমন ছোট ভালো কাজের প্রতিদান আছে, তেমনই সামান্য মন্দ কাজেরও হিসাব হবে। এই আয়াত মানুষকে সতর্ক করে বলে— পাপকে তুচ্ছ ভাবো না, একবারের অবিচারও আল্লাহ ভুলে যান না, কারো মনে কষ্ট দেওয়াও পাপ, দৃষ্টি, ভাষা, হারাম কামাই— সবকিছুর হিসাব হবে। এ আয়াতই ইসলামের নৈতিকতার কেন্দ্রবিন্দু। --- ◇ শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ ১. কিয়ামত এক বাস্তব ঘটনা সুরাটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়— একদিন এই বিশাল পৃথিবী ভেঙে যাবে, মানুষ পুনরুত্থিত হবে, এবং বিচার হবে। ২. পৃথিবীই সাক্ষী দেবে আমরা যেসব স্থানে জীবনে চলাফেরা করি— সেই স্থানগুলো আমাদের কাজ লিখে রাখে। এ থেকে শিক্ষা— সতর্কভাবে চলা, পাপ থেকে দূরে থাকা। ৩. ছোট ছোট আমলের গুরুত্ব একটি মুসমানকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়— এক ফোঁটা ভালো কাজও নষ্ট হবে না। একইসাথে— সামান্য পাপকে হালকা ভাবা উচিত নয়। এই আয়াত ঈমান, নৈতিকতা ও আত্মসংযমের শক্তিশালী ভিত্তি। ৪. আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান পৃথিবী তাঁর আদেশে কম্পিত হয়, তাঁর আদেশে সব উন্মোচন হবে। আমানত, জবাবদিহি, ন্যায়বিচারের চরম বাস্তবতা এখানে ফুটে উঠেছে। ৫. মানুষের কর্মফল অক্ষরে অক্ষরে দেখানো হবে অণু পরিমাণ আমলেরও মূল্যায়ন হবে— এটি ন্যায়বিচারের পরিপূর্ণতা। কেউ অবিচার পাবে না, কেউ অবহেলিত হবে না। ৬. ঈমানদারদের জন্য উৎসাহ যে ছোট ছোট নেক কাজ প্রতিদিন করি— সালাম দেওয়া কারো উপকার করা মসজিদে ছোট দান দোয়া করা সৎ কথা বলা এর সবই মূল্যবান। ৭. পাপকে তুচ্ছ ভাবা যাবে না বিশেষ করে— মিথ্যা, প্রতারণা, অন্যকে কষ্ট দেওয়া, হারাম সম্পদ, কারো সম্পর্কে খারাপ কথা বলা— এতটুকু হলেও হিসাব হবে। --- নিষ্কর্ষ সুরা যিলযাল হলো এমন এক শক্তিশালী স্মারক— যা মানুষকে কিয়ামতের দিন, নিজের কাজের ফল, এবং আল্লাহর ন্যায়বিচার সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করায়। এটি মানুষকে একই সাথে ভয় দেখায় এবং আশার আলো দেয়— ছোট থেকে ছোট ভালো কাজও আল্লাহর কাছে মূল্যবান, আর ছোট পাপ থেকেও বাঁচতে হবে। এই সুরা হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, আমলকে ঠিক রাখে, এবং মানুষকে জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত করে।

Comments

Popular posts from this blog

সূরা মাউন : বঙ্গানুবাদ, নামকরণ, শানে নুযুল, সংক্ষিপ্ত তাফসীর ও শিক্ষণীয় বিষয়

বদরউদ্দীন উমর : জীবন, কর্ম, চিন্তা, বিশ্বাস ও লেখা

সুরা আল মা‌য়িদার ৮নং আয়া‌তের তর্জমা ও ব‌্যাখ‌্যা। ( দার‌সে কোরআন )