সুরা আল মায়িদার ৮নং আয়াতের তর্জমা ও ব্যাখ্যা। ( দারসে কোরআন )
সুরা আল মায়িদার ৮নং আয়াত:
আরবি পঠন
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلٰى أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ
اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوٰى ۖ
وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ
إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
🔊 বাংলা উচ্চারণ
ইয়া আইয়্যুহাল্লাযীনা আমানূ কূনূ কাওয়ামীনা লিল্লাহি শুহাদাআ বিল-ক্বিস্তি;
ওয়া লা ইয়াজরিমান্নাকুম শানা-আনু কাওমিন আলা আল্লা তা‘দিলূ;
ই‘দিলূ হুয়া আকরাবু লিত্-তাক্বওয়া;
ওয়াত্তাকুল্লাহ;
ইন্নাল্লাহা খাবীরুম বিমা তা‘মালূন।
📘 বঙ্গানুবাদ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়ের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সাক্ষী হও।
কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার করতে বিরত না করে।
তোমরা ন্যায়বিচার করো—এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।
আর আল্লাহকে ভয় করো।
নিশ্চয়ই তোমরা যা করছো আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত।”
আয়াত নাযিলের শানে নুযুল:
আয়াত সংখ্যা: ১২০
নাযিলের স্থান: মদিনা
ধরন: মাদানি সূরা
সূরা আল-মায়িদা কোরআনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাদানি সূরা, যা ইসলামী শরিয়তের চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ বিধানসমূহ ধারণ করে।
সূরা আল-মায়িদা কোনো একক ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়নি। বরং এটি বিভিন্ন সময় ও ঘটনার ধারাবাহিকতায় নাযিল হওয়া আয়াতসমূহের সমন্বয়ে গঠিত। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে—
এই সূরাটি নবী ﷺ–এর জীবনের শেষ পর্যায়ের সূরাগুলোর অন্যতম।
১️⃣ শরিয়তের পরিপূর্ণতা (আয়াত ৩)
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম…”
🔹 এই আয়াতটি নাযিল হয়—
হিজরি ১০ম সন, বিদায় হজের দিন আরাফার ময়দানে।
এটি ইসলামের পূর্ণতা ও চূড়ান্ততা ঘোষণা করে।
২️⃣ ন্যায়বিচার ও শত্রুর প্রতিও ইনসাফ (আয়াত ৮)
এই আয়াতের শানে নুযুল হিসেবে তাফসিরকারগণ উল্লেখ করেন—
মক্কা বিজয়ের পর কিছু মুসলমানের মনে কুরাইশদের অতীত নির্যাতনের কারণে কঠোরতা দেখা দেয়। তখন আল্লাহ নির্দেশ দেন—
“কোনো জাতির প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না করে।”
📌 অর্থাৎ, শত্রুতাও ইনসাফের পথে বাধা হতে পারবে না।
২️⃣ সূরা আল-মায়েদার নামকরণের কারণ :
🕋 “আল-মায়েদা” শব্দের অর্থ
মায়েদা (المائدة) অর্থ হলো—
👉 খাবারে পরিপূর্ণ টেবিল / দস্তরখান / খাদ্যভর্তি খাঞ্চা।
📖 নামকরণের পটভূমি
সূরা আল-মায়েদার ১১২–১১৫ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে এক ঐতিহাসিক ঘটনা—
হযরত ঈসা (আ.)–এর শিষ্যরা (হাওয়ারিগণ) আল্লাহর কাছে আকাশ থেকে একটি খাবারভর্তি দস্তরখান (মায়েদা) নাযিল করার আবেদন করেন, যাতে—
তাদের হৃদয় প্রশান্ত হয়
আল্লাহর কুদরত প্রত্যক্ষ করা যায়
ঈমান আরও দৃঢ় হয়
আল্লাহ তাদের দোয়া কবুল করেন, তবে কঠোর সতর্কবার্তা দেন—
এই নিদর্শনের পর কুফরি করলে ভয়াবহ শাস্তি হবে।
➡️ এই অসাধারণ ও শিক্ষণীয় ঘটনা থেকেই সূরাটির নাম রাখা হয়েছে “সূরা আল-মায়েদা”।
আয়াতের মূল শিক্ষা ও ব্যাখ্যা:
এই আয়াতটি কোরআনের নৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এখানে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে চারটি মৌলিক বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন—
১) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দৃঢ়ভাবে ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা,
২) সাক্ষ্য ও সিদ্ধান্তে পূর্ণ ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা,
৩) শত্রুতা বা ব্যক্তিগত বিদ্বেষের কারণেও অন্যায় না করা,
৪) তাকওয়া বা আল্লাহভীতিকে জীবনের মাপকাঠি বানানো।
প্রথমেই বলা হয়েছে, “আল্লাহর জন্য ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী হয়ে দাঁড়াও”। এর অর্থ হলো—ন্যায়বিচার করতে হবে কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে, কোনো ব্যক্তি, দল, গোত্র বা স্বার্থের জন্য নয়। এখানে সাক্ষী শব্দটি শুধু আদালতের সাক্ষ্য নয়; বরং জীবনের সর্বস্তরে সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব বোঝানো হয়েছে।
এরপর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—
“কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না করে।”
মানুষ স্বভাবতই যার সঙ্গে শত্রুতা বা বিরোধ আছে, তার প্রতি অন্যায় আচরণ করতে প্ররোচিত হয়। কিন্তু ইসলাম সেই মানসিকতাকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। শত্রুও যদি ন্যায্য অধিকারী হয়, তবে তার প্রতিও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটি ইসলামের মানবিক ও সার্বজনীন ন্যায়ের অনন্য দৃষ্টান্ত।
এরপর আল্লাহ বলেন— “ন্যায়বিচার করো—এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।”
এখানে ন্যায়বিচারকে তাকওয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। তাকওয়া মানে শুধু নামাজ-রোজা নয়, বরং মানুষের প্রতি ইনসাফ করা, অধিকার রক্ষা করা, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। যে ব্যক্তি ন্যায়বিচার করে, সে প্রকৃত অর্থেই আল্লাহভীরু।
শেষ অংশে বলা হয়েছে— “আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে অবগত।”
এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও আল্লাহর কাছে কিছুই গোপন নয়। বিচার, সাক্ষ্য, সিদ্ধান্ত—সবকিছুর জবাবদিহি আল্লাহর কাছে দিতে হবে।
সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা
এই আয়াত আজকের সমাজ, রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রাজনীতি, প্রশাসন, আদালত, গণমাধ্যম—সব ক্ষেত্রে পক্ষপাত, দলীয় আনুগত্য ও শত্রুতার কারণে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। সুরা আল-মায়িদার এই আয়াত আমাদের শেখায়—
✅ ন্যায় কোনো পক্ষের নয়,
✅ ইনসাফ আবেগের ঊর্ধ্বে,
✅ তাকওয়ার প্রকৃত মাপকাঠি হলো ন্যায়বিচার।
খোলাফায় রাশেদার যুগের কয়েকটি ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত
🕌 ১. হযরত আবু বকর (রা.)–এর ন্যায়বিচার
⚖️ দৃষ্টান্ত: দুর্বল ও শক্তিশালী সমান
খিলাফত গ্রহণের প্রথম ভাষণে হযরত আবু বকর (রা.) বলেন—
“তোমাদের মধ্যে যে দুর্বল, সে আমার কাছে শক্তিশালী—যতক্ষণ না আমি তার হক আদায় করে দিই; আর যে শক্তিশালী, সে দুর্বল—যতক্ষণ না আমি তার কাছ থেকে হক আদায় করে নিই।”
📌 শিক্ষা: শাসকের কাছে সবাই সমান; ক্ষমতা ন্যায় নষ্ট করার হাতিয়ার নয়।
🕌 ২. হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)–এর ন্যায়বিচার
⚖️ দৃষ্টান্ত ১: মিসরের গভর্নরের পুত্র ও সাধারণ নাগরিক
মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আস (রা.)–এর ছেলে এক কিবতি যুবককে অন্যায়ভাবে আঘাত করেন। বিষয়টি খলিফা উমর (রা.)–এর কাছে গেলে তিনি কিবতি যুবককে লাঠি দিয়ে গভর্নরের ছেলেকে প্রতিশোধ নিতে বলেন। এরপর উমর (রা.) বলেন—
“তোমরা কবে থেকে মানুষকে দাস বানালে, অথচ তাদের মায়েরা তাদের মুক্ত জন্ম দিয়েছে?”
📌 শিক্ষা: আইনের চোখে শাসকের সন্তান ও সাধারণ মানুষ সমান।
⚖️ দৃষ্টান্ত ২: নিজের বিরুদ্ধে মামলা
এক ইহুদি নাগরিকের সঙ্গে জমি সংক্রান্ত বিরোধে উমর (রা.) আদালতে হাজির হন সাধারণ অভিযুক্তের মতো। বিচারক শুরাইহ (রহ.) তাকে অন্য পক্ষের মতোই সমানভাবে বসান।
📌 শিক্ষা: শাসক নিজেও আইনের ঊর্ধ্বে নন।
🕌 ৩. হযরত উসমান ইবন আফফান (রা.)–এর ন্যায়বিচার
⚖️ দৃষ্টান্ত: আত্মীয়প্রীতির অভিযোগে শাস্তি
খিলাফতের সময় তার এক আত্মীয় রাষ্ট্রীয় সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ করলে উসমান (রা.) তাকে শাস্তি দেন এবং বলেন—
“আল্লাহর বিধানের সামনে উসমানের আত্মীয়েরও কোনো বিশেষ অধিকার নেই।”
📌 শিক্ষা: আত্মীয়তা ন্যায়বিচারের পথে বাধা হতে পারে না।
🕌 ৪. হযরত আলী ইবন আবু তালিব (রা.)–এর ন্যায়বিচার
⚖️ দৃষ্টান্ত: ইহুদির সঙ্গে ঢাল সংক্রান্ত মামলা
হযরত আলী (রা.)–এর ঢাল হারিয়ে গেলে তিনি এক ইহুদির কাছে তা দেখতে পান। তিনি আদালতে মামলা করেন। বিচারক সাক্ষ্য প্রমাণ না থাকায় ইহুদির পক্ষে রায় দেন। আলী (রা.) রায় মেনে নেন। এতে মুগ্ধ হয়ে ইহুদি ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন।
📌 শিক্ষা: সত্যের সামনে শাসকও পরাজয় স্বীকার করেন।
🌿 শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ
১. ন্যায়বিচার ঈমানের অংশ
মুমিন হওয়ার শর্ত হলো আল্লাহর জন্য ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা—স্বার্থ, দল বা আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে।
২. শত্রুর প্রতিও ন্যায়
যার সঙ্গে শত্রুতা আছে, তার প্রতিও অন্যায় করা ইসলামে নিষিদ্ধ। ন্যায় সবার জন্য সমান।
৩. তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ
তাকওয়া শুধু ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে ন্যায়পরায়ণতা তাকওয়ার পরিচয়।
সাক্ষ্য ও সিদ্ধান্তে সততা
মিথ্যা সাক্ষ্য বা পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত আল্লাহর কাছে মারাত্মক অপরাধ।
৫. আল্লাহর সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান
মানুষ না জানলেও আল্লাহ সব জানেন—এই বিশ্বাস মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে।
✅ উপসংহার
সুরা আল-মায়িদার ৮নং আয়াত ইসলামের ন্যায়বিচার দর্শনের সারসংক্ষেপ। এটি ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় শাসন পর্যন্ত সর্বস্তরে নৈতিকতা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়। শত্রুর প্রতিও ন্যায় করা—এটাই কোরআনের শিক্ষা, এটাই তাকওয়ার সর্বোচ্চ প্রকাশ । এই আয়াত মুসলিম সমাজের জন্য নৈতিকতা, মানবিকতা ও ইনসাফের মৌলিক নীতিমালা স্থাপন করে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব স্তরে ন্যায়ের মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয় এই একটিমাত্র আয়াত 🌍
আপনার মতামত বা অভিজ্ঞতা জানাতে কমেন্ট করতে ভুলবেন না। কোরআনের আরও সূরা , আয়াত ও হাদিস বিষয়ক তথ্য পেতে চোখ রাখুন GKPost24 ব্লগে!
.png)
এই আয়াত আজকের সমাজ, রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রাজনীতি, প্রশাসন, আদালত, গণমাধ্যম—সব ক্ষেত্রে পক্ষপাত, দলীয় আনুগত্য ও শত্রুতার কারণে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। সুরা আল-মায়িদার এই আয়াত আমাদের শেখায়—
ReplyDelete✅ ন্যায় কোনো পক্ষের নয়,
✅ ইনসাফ আবেগের ঊর্ধ্বে,
✅ তাকওয়ার প্রকৃত মাপকাঠি হলো ন্যায়বিচার।