সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত (২২–২৪): আরবীপাঠ, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ, শানে নুজুল, ব্যাখ্যা ও শিক্ষা
সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াতের আরবীপাঠ, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ, শানে নুজুল, ব্যাখ্যা, ফজিলত ও শিক্ষণীয় বিষয়সহ পূর্ণাঙ্গ আলোচনা।
ভূমিকা
পবিত্র কুরআনের ৫৯তম সূরা হলো সূরা আল-হাশর। এই সূরার শেষ তিনটি আয়াত (২২–২৪) আল্লাহ তাআলার মহান সিফাত বা গুণাবলীর এক অনন্য ঘোষণা। এসব আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর একত্ব, জ্ঞান, ক্ষমতা ও সুন্দর নামসমূহ (আসমাউল হুসনা) তুলে ধরেছেন। ঈমান দৃঢ় করা, অন্তর নরম করা এবং আল্লাহভীতির শিক্ষা দিতে এ আয়াতগুলো মুসলিম জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াতের আরবীপাঠ
﴿هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ ۖ هُوَ الرَّحْمَٰنُ الرَّحِيمُ﴾
﴿هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ ۚ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ﴾
﴿هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ ۖ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ ۚ يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ﴾
বাংলা উচ্চারণ
হুয়াল্লাহুল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুয়া; ‘আলিমুল গাইবি ওয়াশ্-শাহাদাহ; হুয়ার রহমানুর রাহীম।
হুয়াল্লাহুল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুয়া; আল-মালিকুল কুদ্দূসুস সালামুল মু’মিনুল মুহাইমিনুল ‘আজীজুল জাব্বারুল মুতাকাব্বির; সুবহানাল্লাহি ‘আম্মা ইউশরিকূন।
হুয়াল্লাহুল খালিকুল বারিউল মুসাও্বির; লাহুল আসমাউল হুসনা; ইউসাব্বিহু লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ; ওয়া হুয়াল ‘আজীজুল হাকীম।
বঙ্গানুবাদ
২২. তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের জ্ঞান রাখেন। তিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
২৩. তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি বাদশাহ, অতি পবিত্র, শান্তিদাতা, নিরাপত্তাদাতা, রক্ষণাবেক্ষণকারী, পরাক্রমশালী, প্রবল ক্ষমতাধর, মহিমান্বিত। তারা যাকে শরিক করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র।
২৪. তিনিই আল্লাহ—সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবনকারী, আকৃতি দানকারী। তাঁরই জন্য সব সুন্দর নাম। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
সূরা হাশরের নামকরণ
এই সূরার নাম “আল-হাশর” রাখা হয়েছে ২ নম্বর আয়াতে ব্যবহৃত “হাশর” শব্দ থেকে, যার অর্থ—সমবেত করা বা একত্রে বের করে দেওয়া। এখানে বনু নাযীর ইহুদি গোত্রকে মদিনা থেকে একত্রে বহিষ্কারের ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
শানে নুজুল
সূরা হাশর মদীনায় নাযিল হয়। এর প্রেক্ষাপট হলো বনু নাযীর নামক ইহুদি গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতা ও তাদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা। সূরার শেষ তিন আয়াত বিশেষভাবে আল্লাহর পরিচয় ও মহিমা তুলে ধরার জন্য নাযিল হয়, যাতে মুমিনরা পার্থিব ঘটনাবলীর মধ্যেও আল্লাহর ক্ষমতা ও গুণাবলী স্মরণ রাখে।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
এই তিন আয়াতে আল্লাহ তাআলার ১৫টিরও বেশি গুণবাচক নাম ও সিফাত বর্ণিত হয়েছে। এখানে আল্লাহর জ্ঞান (অদৃশ্য ও দৃশ্য), দয়া (রহমান, রহীম), শাসনক্ষমতা (মালিক), পবিত্রতা (কুদ্দূস), নিরাপত্তা (সালাম, মু’মিন), শক্তি ও কর্তৃত্ব (আজীজ, জাব্বার, মুতাকাব্বির) এবং সৃষ্টিশীলতা (খালিক, বারী, মুসাও্বির) একত্রে এসেছে। এ আয়াতগুলো মানুষকে শিরক থেকে দূরে রেখে খাঁটি তাওহিদের দিকে আহ্বান জানায়।
ফজিলত
হাদিসে এসেছে—যে ব্যক্তি সকালে ও সন্ধ্যায় সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য ফেরেশতা নিযুক্ত করেন যারা তার জন্য দোয়া করতে থাকে। অনেক আলেম বলেন, এগুলো নিয়মিত পাঠ করলে অন্তরে ঈমানি শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং আল্লাহভীতি জন্ম নেয়।
শিক্ষণীয় বিষয়
১. আল্লাহর একত্ব ও অতুলনীয় গুণাবলীর স্বীকৃতি।
২. শিরক থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার শিক্ষা।
৩. আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক—এই বিশ্বাস দৃঢ় করা।
৪. জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর উপর ভরসা রাখা।
৫. নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও যিকিরের গুরুত্ব উপলব্ধি।
উপসংহার
সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত কেবল তিলাওয়াতের জন্য নয়, বরং হৃদয়ে ধারণ ও জীবনে বাস্তবায়নের জন্য। এগুলো আমাদের আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় শেখায় এবং ঈমানকে মজবুত করে। প্রতিদিনের আমলে এসব আয়াত অন্তর্ভুক্ত করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর।
সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত কেবল তিলাওয়াতের জন্য নয়, বরং হৃদয়ে ধারণ ও জীবনে বাস্তবায়নের জন্য। এগুলো আমাদের আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় শেখায় এবং ঈমানকে মজবুত করে। প্রতিদিনের আমলে এসব আয়াত অন্তর্ভুক্ত করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর।
ReplyDelete