সূরা লাহাব (আল-মাসাদ): আরবি পাঠ, বঙ্গানুবাদ, নামকরণ, শানে নুযুল ও শিক্ষণীয় বিষয়

 

সূরা লাহাব (আল-মাসাদ) এর  বঙ্গানুবাদ, নামকরণ, শানে নুযুল, ব্যাখ্যা ও শিক্ষণীয় বিষয় জেনে নিন এই পোস্ট থেকে । 

GK Post 24

পবিত্র কুরআনের ১১১তম সূরা হলো সূরা লাহাব (سورة اللهب), যা "সূরা আল-মাসাদ" নামেও পরিচিত। এই সূরাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে সরাসরি একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি—রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর পরিণতি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। আজকের লেখায় আমরা জানব সূরা লাহাবের আরবি পাঠ, বাংলা অনুবাদ, নামকরণের কারণ, শানে নুযুল, বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং এই সূরা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষণীয় বিষয়গুলো।

Surah Lahab


সূরা লাহাবের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

সূরা লাহাব মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছিল এবং এটি ইসলামের প্রাথমিক যুগে অবতীর্ণ সূরাগুলোর একটি। এতে মোট ৫টি আয়াত রয়েছে এবং এটি কুরআনের ৩০তম পারায় অবস্থিত। এই সূরাটি কুরআনের একমাত্র সূরা যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো নির্দিষ্ট শত্রুর নাম ও তার শাস্তির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।


সূরা লাহাবের আরবি পাঠ

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ

مَا أَغْنَىٰ عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ

سَيَصْلَىٰ نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ

وَامْرَأَتُهُ حَمَّالَةَ الْحَطَبِ

فِي جِيدِهَا حَبْلٌ مِنْ مَسَدٍ


সূরা লাহাবের বঙ্গানুবাদ

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১. ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত, আর সে নিজেও ধ্বংস হয়েছে।

২. তার ধন-সম্পদ ও উপার্জন তার কোনো কাজে আসেনি।

৩. শীঘ্রই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে,

৪. আর তার স্ত্রীও প্রবেশ করবে, যে ইন্ধন বহনকারিণী,

৫. তার গলায় থাকবে খেজুরের ছোবড়ার পাকানো রশি।


সূরা লাহাবের নামকরণ

সূরাটির প্রথম আয়াতে "আবি লাহাব" (أَبِي لَهَبٍ) শব্দটি এসেছে, যেখানে "লাহাব" অর্থ লেলিহান আগুন বা শিখা। এই শব্দের ভিত্তিতেই সূরাটির নাম রাখা হয়েছে "লাহাব"। আবার সূরার শেষ আয়াতে "মাসাদ" (مَسَدٍ) শব্দটি এসেছে, যার অর্থ খেজুর ছোবড়ার পাকানো রশি—এই শব্দের ভিত্তিতে সূরাটিকে "আল-মাসাদ" নামেও অভিহিত করা হয়।


সূরা লাহাবের শানে নুযুল

সূরা লাহাব অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট ইসলামি ইতিহাসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রকে ডেকে বলেন, "যদি আমি তোমাদের বলি যে, এই পাহাড়ের ওপাশে একদল শত্রুসেনা তোমাদের আক্রমণ করতে আসছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?" সবাই একবাক্যে বলল, "হ্যাঁ, আমরা তোমাকে সত্যবাদী হিসেবেই জানি।" তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, "তাহলে জেনে রাখো, তোমাদের সামনে কঠিন আযাবের দিন আসছে, তাই আল্লাহর একত্ববাদের দিকে ফিরে এসো।"

এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আপন চাচা আবু লাহাব ক্রুদ্ধ হয়ে বলে ওঠে, "তাব্বান লাকা" (ধ্বংস হোক তোমার জন্য)—"তুমি কি আমাদের এই কথা শোনানোর জন্যই ডেকেছ?" এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আল্লাহ তা'আলা সূরা লাহাব অবতীর্ণ করেন, যেখানে আবু লাহাবের এই অভিশাপকেই তার নিজের প্রতি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিলও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি চরম শত্রুতা পোষণ করত এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চলাচলের পথে কাঁটাযুক্ত ডাল ফেলে রাখত, যাতে তিনি কষ্ট পান। এই কারণে তাকে "হাম্মালাতাল হাতাব" (ইন্ধন বহনকারিণী) বলে অভিহিত করা হয়েছে।


সূরা লাহাবের ব্যাখ্যা

সূরাটির প্রতিটি আয়াতে গভীর তাৎপর্য নিহিত রয়েছে।

প্রথম আয়াত এ আবু লাহাবের ধ্বংসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তার নিজের মুখে উচ্চারিত অভিশাপবাণীই তার প্রতি প্রযোজ্য হয়েছে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক কঠোর জবাব।

দ্বিতীয় আয়াত এ বলা হয়েছে, আবু লাহাবের বিপুল ধন-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারেনি। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে যে, পার্থিব সম্পদ ও ক্ষমতা আল্লাহর সামনে কোনো কাজে আসে না।

তৃতীয় আয়াত এ তার পরিণতি হিসেবে জাহান্নামের লেলিহান আগুনে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে।

চতুর্থ ও পঞ্চম আয়াত এ তার স্ত্রীর শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কষ্ট দেওয়ার জন্য কাঁটাযুক্ত ডাল বহন করত বলে তাকেও একই শাস্তি ভোগ করতে হবে, যার প্রতীক হিসেবে তার গলায় পাকানো রশি পরিয়ে দেওয়া হবে।

এই সূরার একটি বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব হলো, এটি ছিল একটি ভবিষ্যদ্বাণী যা পরবর্তীতে হুবহু সত্য প্রমাণিত হয়। আবু লাহাব ও তার স্ত্রী তাদের জীবদ্দশায় কখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি এবং কুফরি অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে, যা এই সূরার ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতাকে প্রমাণ করে।


সূরা লাহাব থেকে শিক্ষণীয় বিষয়

সূরা লাহাব থেকে আমরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি:

  • সত্যের পথে বাধা এলেও অবিচল থাকা: রাসূলুল্লাহ (সা.) নিকটাত্মীয়ের চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও দ্বীন প্রচারে অবিচল ছিলেন—এটি দাওয়াতের পথে ধৈর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
  • সম্পদ ও ক্ষমতা আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারে না: পার্থিব সাফল্য কখনো আল্লাহর অবাধ্যতার শাস্তি থেকে মুক্তি দিতে পারে না।
  • রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ঈমান বড়: আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আপন চাচা হয়েও শুধু কুফরির কারণে তার এই পরিণতি হয়—এটি প্রমাণ করে যে আল্লাহর কাছে বংশীয় সম্পর্কের চেয়ে ঈমান ও আমল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
  • সত্যবাদীদের প্রতি বিদ্রূপ ও শত্রুতার পরিণাম: আল্লাহর রাসূল ও দ্বীনের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণকারীদের জন্য কঠোর শাস্তি অবধারিত।
  • কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা: এই সূরাটি কুরআনের একটি জীবন্ত মুজিযা (অলৌকিকত্ব), কারণ আবু লাহাব ও তার স্ত্রী চাইলেও ইসলাম গ্রহণ করে এই ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণ করতে পারেনি।


উপসংহার

সূরা লাহাব সংক্ষিপ্ত হলেও এতে ইসলামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং গভীর শিক্ষা নিহিত রয়েছে। এটি আমাদের শেখায় যে, সত্যের পথে বাধা যতই আসুক না কেন, আল্লাহর সাহায্য ও ন্যায়বিচার শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিটি মুসলিমের উচিত এই সূরার শিক্ষা থেকে ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা অর্জন করা।


দ্রষ্টব্য: কুরআনের অনুবাদ ও তাফসীর সংক্রান্ত বিষয়ে আরও গভীর জ্ঞানের জন্য নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থ ও স্বীকৃত আলেমদের সাথে পরামর্শ করার পরামর্শ দেওয়া হলো।

Comments

Popular posts from this blog

বদরউদ্দীন উমর : জীবন, কর্ম, চিন্তা, বিশ্বাস ও লেখা

সূরা ক্বা‌ফিরুন : আরবি পাঠ, বঙ্গানুবাদ, নামকরণ, শানে নুযুল ও শিক্ষণীয় বিষয়

বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও কর্ম: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও আপসহীন নেতৃত্বের ইতিহাস